স্টারবাকস কফিশপের মালিক হাওয়ার্ড সুলজের শূন্য থেকে কোটিপতি হওয়ার অবিশ্বাস্য গল্প

0
4611

সিনেমার গল্পে এমন হরহামেশাই দেখা যায়, নায়ক প্রথম জীবনে খুবই গরীব থাকেন, বলা যায় না খেয়ে থাকার দলে। কিন্তু কঠোর পরিশ্রম আর নায়কোচিত স্বভাব তাকে নিয়ে যায় সাফল্যের চূড়ান্ত শিখরে। আজ যে জীবন্ত কিংবদন্তির কথা বলবো, তার উত্থানের গল্প যেন সিনেমাকেও হার মানায়। হাওয়ার্ড সুলজ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ ধনী ব্যক্তিদের অন্যতম। অথচ এই ব্যক্তির শৈশবের অনেক দিন কেটেছে অভুক্ত অবস্থায়। দিনের পর দিন একই পোশাক পরে স্কুল গিয়েছেন। স্কুলের বেতন দিতে বিক্রি করেছেন নিজের শরীরের রক্ত! দারিদ্রের কষাঘাতে জর্জরিত হয়েছেন রোজ, তবু হাল ছাড়েননি। রণে ভঙ্গ দেননি জীবন যুদ্ধে। ভাগ্যের লিখন নিয়ে না ভেবে নিজের হাতে গড়েছেন নিজের ভাগ্য। হয়েছেন আমেরিকার মত দেশের অন্যতম শীর্ষ ধনী। আজ বলবো এই জীবন্ত কিংবদন্তির সাফল্যের গল্প।

Image result for স্টারবাকস কফিশপের মালিক হাওয়ার্ড

যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের ব্রুকলিনে ১৯৫৩ সালের ১৯ জুলাই এক দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন হাওয়ার্ড সুলজ। ট্রাক চালক বাবার একমাত্র রোজগারে সংসার চলে মোটামুটি। কিন্তু ১৯৬০ সালে হঠাৎ নেমে আসে বিপর্যয়। এক দুর্ঘটনার কবলে পড়ে পা হারান সুলজের ট্রাক চালক বাবা। কিন্তু ১৯৬০ সালে নিয়ম আইনের এতটা কড়াকড়ি ছিল না যুক্তরাষ্ট্রে। তাই পঙ্গু ট্রাক শ্রমিক হিসেবে কোনো বিশেষ ভাতা বা সহযোগিতা পাননি সুলজের বাবা। আবার নিজে এতটা সচেতন না হওয়ায় কোনো স্বাস্থ্যবীমা ছিল না তার। ফলে চরম দারিদ্রের এক অকুল পাথারে পড়েন তারা। এই দারিদ্র্যতার মধ্যেই চলে জীবন যুদ্ধ।

এমন দারিদ্র্যকতার সাথে যুদ্ধ করতে করতে এগিয়ে চলে সুলজের লেখাপড়া। প্রাথমিক স্কুল পার হয়ে মাধ্যমিক, তারপর মাধ্যমিক পার হয়ে কলেজ। স্কুলের বেতন পরিশোধ করতে নিজের শরীরের রক্ত পর্যন্ত বিক্রি করেছেন তিনি, কিন্তু স্কুল ছাড়েননি! এই সময়ের মধ্যে সুলজ ক্রমাগত চেষ্টা করে যান নিজের ভাগ্য বদলের। ততদিনে তার পরিবার ভিখারীর পর্যায়ের গিয়ে ঠেকেছে! ভালো কোনো সুযোগের কথা শুনলেই সেখানে চেষ্টা করেন, কোথায় কোন স্কলারশিপ দেওয়া হয় তার খোঁজ রাখতে শুরু করেন সুলজ।

Image result for starbucks howard schultz

অবশেষে অরিবত চেষ্টায় ভাগ্য দেবতা মুখ তুলে চায়। সুলজ ভালো ফুটবল খেলতেন আর এই গুণের কারণেই নর্দান মিশিগান ইউনিভার্সিটির অ্যাথলেটিক স্কলারশিপ পেয়ে যান। এই বৃত্তি সুলজ এবং তার পরিবারে অনেকটা স্বস্তি এনে দেয়।

Image result for স্টারবাকস কফিশপের মালিক হাওয়ার্ড

১৯৭৫ সালে নর্দান মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করে সুলজ নেমে পড়েন জীবনের নতুন অধ্যায় রচনায়। এ যাত্রায়ও তাকে ছুটতে হয়েছে বেশ। অবশেষে জেরেক্স কোম্পানিতে বিপণন প্রশিক্ষক পদে চাকুরি পেয়ে যান। এখানে কাজ করেন টানা ৩ বছর। ৩ বছর পর জেরেক্স কোম্পানির চাকরি ছেড়ে দিয়ে যোগ দেন সুইডেন ভিত্তিক নতুন একটি কোম্পানিতে। পারসটর্প নামের এই কোম্পানি ঘর-গৃহস্থলী সামগ্রী ও তৈজসপত্র বিক্রয় করে।
এই প্রতিষ্ঠানে যোগ দেওয়ার পর ক্রমান্বয়ে পদোন্নতি পেতে পেতে জেনারেল ম্যানেজার পর্যন্ত হয়েছিলেন সুলজ। শুধু নিজের পদোন্নতি হয়েছে তা নয়, প্রতিষ্ঠানকে করে তোলেন পূর্বের যে কোন অবস্থার চেয়ে লাভজনক।

এর পরের ঘটনা আরও নাটকীয়। নতুন কিছুর নেশা যার মনে তাকে কী আটকে রাখা যায়? পারসটর্পে চাকরিরত অবস্থায় সন্ধান পান এক জমজমাট জনপ্রিয় কফিশপের। নাম স্টারবাকস। যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটলের গুটিকতক কফিশপের মধ্যে স্টারবাকস ছিল সবচেয়ে জনপ্রিয়। সারাক্ষণ ভিড় লেগেই থাকতো। এই জনপ্রিয়তায় এতটাই মুগ্ধ হন যে, সুলজ একদিন স্টারবাকসের মালিক জেরান্ড ব্যান্ডইউন ও গর্ডন বোকারের সাথে সাক্ষাত করে তাদের ব্যবসায়িক সাফল্যের জন্য অভিনন্দন জানান ও তাদের প্রতিষ্ঠান নিয়ে নিজের মুগ্ধতার কথা প্রকাশ করেন। তিনি স্টারবাকসের এই মালিকদ্বয়ের পরিশ্রম ও সাহসিকতারও প্রশংসা করেন।

বিখ্যাত টিভি উপস্থাপক অপেরা উইনফ্রের সাথে হাওয়ার্ড সুলজ photo: freegood.info

এটা এক ধরণের বিপণন কৌশল। সুলজ জানেন কোথায় কোন কৌশল কাজে লাগাতে হয়। এই প্রশংসা জ্ঞাপনের ঠিক এক বছর পর সুলজ আমন্ত্রণ পান স্টারবাকসের বিপণন পরিচালক হওয়ার। ২৯ বছর বয়সী সুলজ তখন স্টারবাকসে যোগ দিতে দ্বিতীয়বার ভাবেননি, কেননা তিনি জানতেন এই প্রতিষ্ঠানের রয়েছে বিপুল সম্ভাবনা। তখন বাড়িতে বাড়িতে পার্সেল কফি সরবরাহ করতে সল্প সংখ্যক কর্মী নিয়ে হিমসিম খাচ্ছিল কর্তৃপক্ষ। এমনই একটি সময়ে স্টারবাকসের মাত্র তিনটি আউটলেট থাকা অবস্থায় যোগ দেন সুলজ।

নতুনত্বের নেশায় মত্ত যে তিনি নতুন কিছু করবেনই। সুলজ নতুন কিছু বিপণন আইডিয়া নিয়ে স্টারবাকস মালিকদের সাথে কথা বলেন। তার সব আইডিয়া বাস্তবায়ন করতে রাজি হননি। সুলজ মনোক্ষুন্ন হন, চাকরি ছেড়ে দেন। সময়টা ১৯৮৫ সাল। এই সাহসী সিদ্ধান্ত সুলজের ক্যারিয়ারের বাঁক বদল করে দেয়।

Image result for স্টারবাকস কফিশপের মালিক হাওয়ার্ড

একই সময়ে ক্রমাগত লোকসানের ধাক্কা সইতে না পেরে এক ইতালীয় তার কফিশপ বন্ধ করে দিচ্ছিলেন। ‘জিওরনেল’ নামের লোকসানে থাকা এই কফিশপটি কিনে নেন সুলজ। এরপর স্টারবাকসে যেসব আইডিয়া বাস্তবায়ন করতে পারেননি, তা একে একে প্রয়োগ করতে শুরু করেন। মাত্র ২ বছরের নিরলস প্রচেষ্টায় শূন্য থেকে প্রায় ১ দশমিক ৬ মিলিয়ন আয় করেন সুলজ। এই কফিশপ প্রায় পাঁচ বছর চালানোর পর ১৯৮৭ সালে ছেড়ে আসা প্রিয় কফিশপ স্টারবাকস কিনে নেন ৩ দশমিক ৮ মিলিয়ন ডলারে।

সুলজ যখন স্টারবাকসে যোগ দেন তখন স্টারবাকসের শাখা ছিল ৩টি। ৫ বছর পর যখন কিনে নেন তখন শাখা ছিল ৬টি। আর তার ঠিক ৫ বছর পর ১৯৯২ সালে সারা আমেরিকা জুড়ে শাখা হয় ১৬৫টি। আর বাৎসরিক রোজগার দাড়ায় ৯৩ মিলিয়ন ডলারে। এখন সারা পৃথিবীব্যাপী ৬৫টি দেশে স্টারবাকসের শাখা আছে ২২ হাজারের অধিক এবং বাৎসরিক আয় প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার।

Image result for স্টারবাকস কফিশপের মালিক হাওয়ার্ড

এত সাফল্যের পর সুলজ নিজের অতীত ভুলে যাননি। দুর্ঘটনার পর কোন বিমা না থাকায় বাবার করুণ পরিণতি নিজের চোখে দেখেছেন তিনি। তাই নিজের কর্মীদের জন্য বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা করেছেন। কর্মীদের সব বিষয়ে তিনি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেন।

তথ্যসূত্র: ইউকিপিডিয়া, স্টারবাকস নিউজরুম, বিজনেস ইনসাইডার ও ফোর্বস।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here