ভুল থেকে শিক্ষা নিয়েই দাঁড়িয়ে আছে আজকের কোকা-কোলা, নেটফ্লিক্স আর অ্যামাজন

0
8458

২০১৬ সালের মে মাসের ঘটনা, কোকা-কোলার নতুন প্রধান নির্বাহী হিসেবে যোগ দিলেন জেমস কোয়েন্সি। কোকা-কোলার সব রুই কাতলাদের সাথে প্রথম মিটিংয়েই তিনি বললেন, “আপনারা ভুল করার ভয় থেকে বরং সরে আসুন। ভুল থেকে শেখার মত ফলপ্রসু আর কিছুই নেই।”

কোকা-কোলার প্রধান নির্বাহী হিসেবে যোগ দেওয়ার পর জেমস কোয়েন্সি তার অধীনস্থদের সবসময়ই নতুন কিছু চিন্তার প্রতি গুরুত্ব দিয়েছেন। চিন্তাটা বাস্তবায়ন করার যোগ্য হলে তা করে দেখানোর সাহস দিয়েছেন। ভুল করার উৎসাহ দিয়েছেন। ১৮৮৬ থেকে ২০১৭ সালের সময়ের দীর্ঘ পরিক্রমায় মানুষের রুচির পরিবর্তন হয়েছে সাথে সাথে বদলেছে সমাজের প্রেক্ষাপট কিন্তু এই ১৩১ বছরের ইতিহাসে সেরা কোমল পানীয়ের জায়গাটি আগলে রেখে দিব্যি টিকে আছে কোকা-কোলা।

জেমস কোয়েন্সি কোকা-কোলার প্রধান নির্বাহী, ভুল করতেই উৎসাহ দেন যিনি; ছবিসূত্রঃ coca-colacompany.com

সাধারণ মানুষের মনে হয়তো এই ধারণা থাকতেই পারে, কোকা-কোলা হয়তো কোনো ভুল করেনি বলেই টিকে আছে। ব্যাপারটি কিন্তু মোটেও সেরকম নয়। কোকা-কোলা ভুল করেছে, পা ফসকে বাজার হারিয়েছে বহুবার। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে স্থানীয় উঠতি কোমল পানীয়ের সাথে যুদ্ধ করে বার বার ক্লান্তও হয়েছে এই কোমল পানীয় নির্মাতা প্রতিষ্ঠান। ছোট বড় সব ব্র্যান্ডের ভীড়ে বাজার হারিয়ে ফেলার জন্যে দায়ী ভুলগুলোকে খুঁজে বের করে একদিকে যেমন মানের উন্নয়ন করেছে ঠিক তেমনি বিজ্ঞাপন দিয়ে মানুষের আরো কাছে পৌঁছে যাওয়ার চেষ্টা করেছে তারা। এভাবেই যতবার ভুল করেছে ঠিক ততবার শিক্ষা নিয়েই এত দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েছে তারা।

শুধুই কি কোকা-কোলা?

‘নেটফ্লিক্স’ অনলাইন স্ট্রিমিং জগতে এক অপ্রতিদ্বন্দীর নাম। উত্থান পতনের মধ্যে দিয়ে যাওয়া এই প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহীর মতে ভুল না করলে আপনার কাছে বোঝার সুযোগ নেই আপনি সঠিক পথে আছেন কিনা। সম্প্রতি নেটফ্লিক্স “Sense8” কিংবা “The Get Down” এর মত জনপ্রিয় শোও বন্ধ করে দিয়েছে। অনেকের মতেই ব্যাপারটা নেটফ্লিক্সের জন্য হিতে বিপরীত হতে পারে।

নেটফ্লিক্স প্রধান নির্বাহী রিড হ্যাস্টিংস; ছবিসূত্রঃ mobe.com

কিন্তু নেটফ্লিক্স প্রধান নির্বাহী রিড হ্যাস্টিংস অনেকটাই অনড়, তিনি তার পরীক্ষা নিরীক্ষা চালিয়েই যাবেন। তার সহজ সরল স্বীকারোক্তিটি ঠিক এইরকম,

“You have to try more crazy things, because we should have a higher cancel rate overall.”

১৯৯৭ সালে চালু হওয়া এই কোম্পানি সাফল্যের দৌড়ে যে কতটা এগিয়ে তা তাদের সাবস্ক্রাইবার সংখ্যার দিকে একবার তাকালেই বোঝা যায়। ২০১৭ সালের অক্টোবর নাগাদ বিশ্বব্যাপী নেটফ্লিক্সের সাবস্ক্রাইবার সংখ্যা ঠেকেছে ১০৯ মিলিয়নের ঘরে, যার প্রায় অর্ধেকই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। এই ১০৯ মিলিয়ন গ্রাহকের চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে নিত্যনতুন যত ভুলগুলো হচ্ছে তা সাদরে গ্রহণ করে সেগুলো থেকে শিক্ষা নিয়েই অনলাইন স্ট্রিমিংয়ের জগতে অপ্রতিদ্বন্দীর আসনটি দখল করেছে নেটফ্লিক্স।

তালিকায় বাদ যায়নি অ্যামাজনও

অ্যামাজন যখন ‘Whole Foods’ কে কিনে নেয় তখন অনেকেই মনে করেছিলো জেফ বেজোস কুড়ালটা ঠিক নিজের পায়েই মারছেন। তবে অ্যামাজন প্রধান নির্বাহী জেফ বেজোস অনেকটাই কোকা-কোলা আর নেটফ্লিক্সের প্রধানের পথ ধরেই হেঁটেছেন। ভুল করেছেন, সেখান থেকে শিখে নিজেকে টেনে নিয়ে গেছেন উন্নতির শিখরে।

অ্যামাজন প্রধান নির্বাহী জেফ বেজোস, ভুল করতেই যিনি ভালোবাসেন; ছবিসূত্রঃ nytimes.com

নিজের রিস্ক নেওয়া আর ভুল করার এই প্রবণতাকে অনেকটা ইতিবাচকভাবেই গ্রহণ করেন জেফ বেজোস। তার মতে,

“If you’re going to take bold bets, they’re going to be experiments.”

২০১৪ সালের কথা, অ্যামাজন বাজারে এনেছিলো নিজেদের তৈরী স্মার্টফোন। ক্রেতাদের মনোযোগ আকর্ষণে ব্যর্থ হয়ে শেষ পর্যন্ত স্মার্টফোনটির দাম কমাতে কমাতে ৯৯ সেন্ট এ নিয়ে আসে অ্যামাজন কতৃপক্ষ।

অ্যামাজন তৈরি স্মার্টফোন হাতে প্রধান নির্বাহী জেফ বেজোস; ছবিসূত্রঃ nytimes.com

বাজারের গতিবিধি আর প্রতিযোগীদের অবস্থান না বোঝার কারণেই স্মার্টফোনের বাজারে প্রথমবারেই ছিটকে পড়ে তারা। ব্যর্থ হয় সাধারণ ক্রেতাদের মনোযোগ আকর্ষণে। কিন্তু বরাবরের মতোই জেফ বেজোস তার কোম্পানির সবচেয়ে দক্ষ ব্যক্তিদেরকে ভুলগুলোকে খুঁজে বের করার কাজে নিয়োজিত করেন

কাগজের বইকে টেক্কা দিতেই অ্যামাজন বাজারে আনে ‘কিন্ডল ইলেক্ট্রনিক রিডার’। ১০ বছর আগে ২০০৭ সালে কিন্ডল যখন বাজারে আসে তখন অনেকেই এটিকেও অ্যামাজনের ‘লস প্রজেক্ট’ বলেই আখ্যা দিতেন।

অ্যামাজনের নির্মিত ‘কিন্ডল ই-রিডার’; ছবিসূত্রঃ commons.wikimedia.org

কাগুজে বইকে ছাপিয়ে না গেলেও ই-রিডারের জগতে যে ধীরে ধীরে কিন্ডল অপ্রতিদ্বন্দী হয়ে উঠেছে তা বলাই বাহুল্য। আর এর সব কিছুই সম্ভব হয়েছে শুরুর দিকের করা ভুলগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে আর ভবিষ্যতের চিন্তা মাথায় রেখে।

বড় বড় কোম্পানিগুলোর প্রধান নির্বাহীরা যে ভুল করে মোটেও গুটিয়ে বসে থাকেন তা না বরং ভুল করার কারণটি খুঁজে বের করার জন্য রীতিমত দক্ষযজ্ঞ শুরু করেন। ভুলগুলো থেকে শেখার চেষ্টা করেন। কারণ কর্পোরেট জগতের শেখার মূলমন্ত্রই হলো,

                                                              “If you’re not prepared to fail, you’re not prepared to learn.”

পাশাপাশি বাজার আর প্রতিযোগীরাও বসে নেই, বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের ব্যবসায় আপনার প্রতিযোগীরাও আপনার পা ফসকে আলুর দম হওয়ার অপেক্ষায় থাকে। তাই ভুল করে হারিয়ে গেলে আপনার প্রতিযোগী বরং সে সুযোগটি লুফে নিবে। তাই কর্পোরেট জগতে টিকে থাকতে হলে একদিকে যেমন ভবিষ্যতের বাজার চিন্তা করে রিস্ক নেওয়ার মানসিকতা থাকতে হবে পাশাপাশি সেই রিস্কগুলো থেকে উদ্ভূত ভুলগুলো থেকেও শিক্ষা নিতে হবে। জেমস কোয়েন্সি, রিড হেস্টিংস কিংবা জেফ বেজোস সহ ব্যবসা সফল সব কর্পোরেট প্রধান নির্বাহী এই মূলমন্ত্রেই উজ্জীবিত।

ফিচার ইমেজঃ ideascale.com

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here